আইনস্টাইন কি আসলেই নাস্তিক ছিলেন

এ বছর* মার্চের ১৭ তারিখ বাইসেপ (BICEP) গবেষণা গ্রুপ হাভার্ড-স্মিথসোনিয়ান জ্যোর্তিপদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্রে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। বিজ্ঞানের জগতে এ এক অনন্য আবিষ্কার। যদি আরো অধিক গবেষণা দ্বারা এর সত্যতা নিখুঁতভাবে প্রমাণিত হয়, তবে বিজ্ঞানের জগতে আরো নতুন কিছু অতীব গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হবে[১]

প্রথমত, এটি হবে আইনস্টাইনের ধারণার প্রথম বাস্তব পর্যবেক্ষণ। আইনস্টাইন ১৯১৬ সালে তার সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে বলেছিলেন যে, অধিক ভরের ত্বরান্বিত বস্তুরা পরস্পরের সাথে ধাক্কা খেয়ে স্থান-কালকে এমনভাবে বিকৃত করে দেয় যে সেটা তরঙ্গ আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। আর এই তরঙ্গই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। দ্বিতীয়ত, এই আবিষ্কার ‘ইনফ্লেশন’ তত্ত্বের সত্যতা যাচাই করবে। এই তত্ত্বটি অ্যালেন গুথ ১৯৮০ সালে প্রস্তাব করেন। এতে বলা হয়, বিগব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্ব এক সেকেণ্ড থেকেও অনেক ক্ষুদ্র সময়ের জন্য সূচকীয় হারে বৃদ্ধি পায়। আর এর পরপরই মহাবিশ্ব আবার স্বাভাবিক সম্প্রসারণে ফিরে আসে যেভাবে বর্তমানে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। তৃতীয়ত, বাইসেপ কর্তৃক আবিষ্কৃত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ একটি কোয়ান্টাম ঘটনা। যদি তাই হয় তবে আলোর ক্ষেত্রে যেমন শক্তির ন্যূনতম প্যাকেট পাওয়া যায় যাকে আমরা ফোটন বলি, ঠিক তেমনি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে শক্তির ন্যূনতম প্যাকেট থাকবে এবং একে ‘গ্র্যাভিটন’ বলা হবে। আর এই গ্র্যাভিটন-ই হবে মহাকর্ষীয় বলের ধারক। নতুন এই উদ্ভাবন ‘বিগ ব্যাঙ’ তত্ত্বের সত্যতাকেও সমর্থন করে।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন 

বিজ্ঞানের এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে মোটামুটি সাইজের একটি টেলিস্কোপ দিয়ে যেটাকে অ্যান্টার্কটিকায় বরফের উপর স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই একে আরো ব্যাপকভাবে দেখছেন। ইনফ্লেশন কীভাবে বন্ধ হল এ ব্যাপারে পদার্থবিজ্ঞানীদের এখনও কোন ধারণা নেই এবং আমরা শুধু এতটুকু জানি যে বর্তমান মহাবিশ্ব তৈরির জন্য ইনফ্লেশন থেমে গিয়েছিল। কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা অনুসারে ইনফ্লেশন একটি চির-চলমান ঘটনা।

এ দুটি বিপরীতমুখী শর্তের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য অনেক পদার্থবিদ অসংখ্য মহাবিশ্বের ধারণা করেন। একটি মহাবিশ্বে ইনফ্লেশনের পর ইনফ্লশেন ফিল্ড আরেকটি মহাবিশ্বে স্থানান্তরিত হয়। এই ধারণার কারণে অনেক বিজ্ঞানী এবং সমাজ সমালোচক দাবী করেন যে প্রভু বা স্রষ্টা বলতে কিছু নেই, মহাবিশ্ব কারো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বিস্তার লাভ করছে, একটি মহাবিশ্ব তার পূর্বের মহাবিশ্ব থেকে জন্মলাভ করছে। এমনকি নতুন এই উদ্ভাবনের পূর্বেই, ইনফ্লেশন এবং বহু মহাবিশ্বের ধারণা ব্যবহার করে নাস্তিকতার উপর বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন বই, ভিডিও এবং লেকচার তৈরি করা হয়েছিল। এ সবের মধ্যে লরেন্স এম. ক্রজ-এর ‘A Universe from Nothing’ বইটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এ বইটিতে তিনি মহাবিশ্ব আপনা আপনি তৈরি হয়েছে- এর পক্ষে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

‘বিগ ব্যাঙ বা মহাবিস্ফোরণ ব্যাখ্যার জন্যে তৈরি প্রায় সবগুলো তত্ত্বই আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ জন্য ক্রজ সহ আরো অনেক কসমোলজিস্ট বিংশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীকে নাস্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। ক্রজের পাশাপাশি রিচার্ড ডকিন্সও তার ‘The God Delusion’ বইয়ে একই দাবি করেছেন।

কিন্তু ক্রজ এবং ডকিন্স  ইতিহাসের একটি বড় ধরনের অপব্যাখ্যা করছেন। আইনস্টাইন অবশ্যই আস্তিক ছিলেন। তবে সাধারণ মানুষের কাছে ‘স্রষ্টা’র সংজ্ঞা যে রকম ছিল তাঁর কাছে সে রকম ছিল না। আমি প্রায় পনের বছর ধরে আইনস্টাইনের লেখা নিয়ে গবেষণা করছি। তাই, এই ভুল ধারণা সংশোধন করা আমার মৌলিক দায়িত্ব।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন স্পিনোযা-এর প্রভুতে বিশ্বাস করতেন। স্পিনোযা ছিলেন একজন ডাচ দার্শনিক। তার মতে প্রভু হচ্ছে এমন সত্ত্বা যিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর নিয়ম নীতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন কিন্তু তিনি মানুষের ভাগ্য বা আচার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করেন না। আইনস্টাইনের কাছে, প্রভু হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্রের স্রষ্টা। আর তিনি তার সারা জীবন এই সূত্রগুলো খুঁজে বের করার কাজে ব্যয় করেছেন। তার এই ধারণা পশ্চিমা বিশ্বের প্রচলিত সব ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে আলাদা। কিন্তু এটাও ঠিক ক্রজ এবং ডকিন্স যে রকম নাস্তিকতার ধারণা পোষণ করেন আইনস্টাইন এসব ধারণা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেছেন। ক্রজ আইনস্টাইনের কথার আসল ব্যাখ্যা না দিয়ে তার বইয়ে নিজের মত করে একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। রিচার্ড ডকিন্সও তার বইয়ের ‘A Deeply Religious Non-Believer’ অধ্যায়ে আইনস্টাইনকে উল্লেখ করে একই ধরনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

১৯১৩ সালে যখন তিনি প্রাগুতে ছিলেন তখন তিনি ইহুদীদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে যেতেন এবং স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে কথা বলতেন। ফলসিং এবং ফ্রাঙ্কের মত অনেক জীবনীলেখক এই কথা স্বীকার করেছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্ব আপনা আপনিই শূন্য থেকে তৈরি হয়ে যায়নি। আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন,
আমি বিশ্বাস করি না যে স্রষ্টা এই বিশ্ব নিয়ে লুডো খেলেন। 

যখন তিনি তার আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সাথে বিরোধপূর্ণ একটি বাস্তব পর্যবেক্ষণের কথা শুনেছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন,
স্রষ্টা খুবই ধূর্ত, কিন্তু কখনই বিদ্বেষপরায়ণ নয়। 
তার একটা বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে,
আমি স্রষ্টার চিন্তাকে জানতে চাই-এছাড়া বাকি সবই বিস্তৃতি। 
এ কথার দ্বারা তিনি আসলে বুঝাতে চেয়েছেন যে স্রষ্টা কিভাবে এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি তা জানতে চান কিন্তু তিনি কোন প্রাকৃতিক ঘটনায় বিশ্বাসী নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রংধনু কী বা কেমন তাতে আইনস্টাইনের কোন আগ্রহ নেই কিন্তু রংধনু কেন বিদ্যমান এটাই তার চিন্তার কারণ।
আইনস্টাইন বিশিষ্ট জ্যোর্তিবিদ এরউইন ফিনলে-ফ্রন্ডলিখ এর কাছে ১৯১৪ সালে একবার একটা ব্যক্তিগত পত্র লিখেছিলেন। আমি এটা সর্বপ্রথম খুঁজে পাই। পত্রটি জার্মান ভাষায় লিখা ছিল। আমার বাবা জার্মান ভাষায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন।
আইনস্টাইন  সেই চিঠিতে লিখেছিলেন,
এটা খুবই লজ্জাস্কর যে স্রষ্টা আমাদেরকে বৃহস্পতির চেয়ে বড় গ্রহ দেননি। 

আইনস্টাইন এ কথা বলেছিলেন যখন তিনি এবং ফ্রন্ডলিখ বৃহস্পতির চারদিকে নক্ষত্রের আলো বাঁকিয়ে যাওয়া শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আইনস্টাইন এ কাজ করতে চেয়েছিলেন ‘বিশাল ভরের বস্তুর চারদিকে স্থান-কাল বেঁকে যায়’ –আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্বের সাহায্যে তা প্রমাণ করার জন্য। পাঁচ বছর পরেই আর্থার এডিংটন সূর্যের পূর্ণ গ্রহণের সময় এর চারদিকে আলো বেঁকে যায়- এটি শনাক্ত করেন।

আইনস্টাইন সব সময় এক অদৃষ্ট স্রষ্টার উপর বিশ্বাস রেখে তার সব চিন্তা করতেন। যে স্রষ্টা পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র বানিয়ে রেখেছেন-যিনি অচল বৃদ্ধ জেনেসিসের মত না বরং যিনি এই মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন, তা না করলেও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো অবশ্যই তৈরি করেছেন। আমরা বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার নিয়ে যত বেশি চিন্তা করছি ততই বুঝতে পারি আইনস্টাইন তার বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনায় কতটা সঠিক ছিলেন। তাই আমাদের সামর্থের উপর এতটা আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত না যে, আমরা আইনস্টাইনের স্রষ্টাকে অস্বীকার করব।

* অরিজিনাল আর্টিকেলটি ১৪ জুন, ২০১৪ তারিখে আপডেট হয়।
[১] ২০১৬ সালে এর সত্যতা প্রমাণিত হয় - সম্পাদক।

মূলঃ আমির আকজেল, গণিতবিদ ও গবেষক, বোস্টন ইউনিভার্সিটি। তিনি ফার্মার শেষ উপপাদ্যসহ গণিত ও পদার্থবিদ্যার অনেকগুলো জনপ্রিয় বইয়ের লেখক।
রূপান্তরঃ ইকরামুল হাসান

সূত্রঃ হাফিংটন পোস্ট


EmoticonEmoticon